নারায়ণগঞ্জ জেলায় ব্যাপক হারে বাড়ছে শিশু শ্রম।




শেখ এনামূল হক বিদ্যুৎঃ

নারায়ণগঞ্জ জেলায় ব্যাপক হারে বাড়ছে শিশু শ্রম।
 আড়াইহাজার,রুপগঞ্জ,বন্দর,ফতুল্লা ও সোনারগাঁও  উপজেলায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় এখানে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পরিণত বয়সের আগে শিশু-কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত না হওয়ার নানা নীতিমালা থাকলেও এ ব্যাপারে প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই বা চোখে পড়ছে না।
রাষ্ট্রের প্রদত্ব মৌলিক অধিকারের সঠিক প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন নেই। 
 ফলে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনে পড়ে খুব সহজেই শ্রমিকের জীবন বেছে নিচ্ছে শিশুরা।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সিটি কর্পোরেশন,পৌরসভা সহ বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র মা-বাবার ৮ -১২ বছর বয়সী শিশু-কিশোররা রীতিমতো শিশুশ্রমে জড়িয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। যে বয়সে তাদের বই, কলম ও খাতা হাতে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ছে হতভাগ্য এসব শিশু।কারখানা,হকারগিরি, কুলিগিরি, ভ্যান-রিকশা চালানো, রাজমিস্ত্রির জোগালি কিংবা ইটভাটায় কাজ করছে তারা।

নারায়ণগঞ্জ জেলায় বিভিন্ন মিল-কলকারখানা-গার্মেন্টস শিল্প তৈরি হওয়ায়, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মিথ্যা বয়স দেখিয়ে জন্ম নিবন্ধন আর ভুয়া অষ্টম শ্রেণি পাসের সার্টিফিকেট তৈরি করে অপ্রাপ্ত বয়সেই চাকরিতে ঢুকছে তারা। শিশু বয়সে কঠোর পরিশ্রম আর শারীরিক শ্রমের কারণে হরহামেশাই তাদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে।

শিশু অটোরিকশা চালক সাকিব জানান, সংসারে অভাব। তাই বাবা তাকে অটোরিকশা কিনে দিয়েছেন। সে প্রতিদিন যা আয় করে তা দিয়েই তার সংসারে চলে।

শিশু ঝালমুড়ি বিক্রেতা  লাবিব জানায়, তার বাবা নেই তাই তার সংসার চালানোর জন্য সে ঝালমুড়ি বিক্রি করে থাকে।এতে করে সংসারের সবাই কে নিয়ে কোনো মত জীবিকা নির্বাহ করছে লাবিব।

বন্দর থানার মুছাপুর গ্রামের কিশোরী নার্গিস কাজ করে স্থানীয় একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে। সে বলে, ‘আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালে বাবা এক্সিডেন্টে পঙ্গু হয়ে যায়। ছোট তিন ভাই-বোন আর মা-বাবার ভরণ-পোষণের জন্য অষ্টম শ্রেণি পাসের সার্টিফিকেট দিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছি। সেখান থেকে যা পাই তা দিয়ে কোনো রকম টেনেটুনে সংসার চলাই।’ 

জেলার সব এলাকার শিশুরাই কমবেশি শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। তবে বিশেষ এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শিশু শ্রমিকদের বেশির ভাগ পিতৃহীন। কারো কারো মা-বাবার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ায় দেখার মতো কেউ নেই। তাই হাসি-খুশি, দুরন্ত-চঞ্চল এসব শিশুকে বাধ্য হয়ে সংসারের ঘানি টেনে যেতে হচ্ছে। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাগ্যবিড়ম্বিত হয়ে অনেক শিশুই অকালে ঝরে পড়ছে। উপজেলায় বিভিন্ন সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান থাকলেও ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার এসব শিশুকে নিয়ে কেউ ভাবে না। তাদের শিশুশ্রম বন্ধ করে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয় না কেউ। শিশুশ্রম বন্ধে আইনের প্রয়োগ না থাকায় প্রতিনিয়ত আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে শিশুশ্রমের সংখ্যা।

জেলা শিক্ষা অফিসার (মাধ্যমিক) সাহিদা বেগম নাজমা বলেন, বৈশ্বিক করোনার প্রভাবে ‘আমাদের আশপাশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশুশ্রম। এ থেকে বেরিয়ে আসতে আমরা বিগত সময়ে স্কুলগুলোতে প্রতি মাসে একবার অভিভাবক সমাবেশ করছিলাম। তা ছাড়া প্রতি সপ্তাহে একেক দিন একেক এলাকায় গিয়ে শিক্ষকরা খোঁজখবর নিতেন কারা স্কুলে আসছে কারা আসছে না। কিন্তু এখন করোনার জন্য স্কুল বন্ধ থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। করোনার পর স্কুল খুলবে তখন তাদের অভিভাবকদের বিনা মূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তিসহ নানা উদ্যোগের কথা জানিয়ে এই সমস্ত শিশু শ্রমিকদের স্কুলগামী করার চেষ্টা করা হবে ।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দীন বলেন,শিশুশ্রম একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
শিশুশ্রম একবারেই বন্ধ হয়ে গেছে তা নয়,তবে আগের থেকে এখন অনেক কম। কোন কারখানা,মেইল ফ্যাক্টরিতে শিশুশ্রম হচ্ছে, এমন কোন তথ্য আমাদের কাছে আসলে সংশিলিষ্ট কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে শিশুশ্রম আইনে তাৎখানিক ব্যাবস্থা নেয়া হয়।

No comments

Powered by Blogger.