প্রদীপ বলে কলমা পড়,তুই এবার শেষ।


 সদ্য সংবাদ ডেস্কঃ

মেজর (অব.) সিনহা হত্যা মামলার আসামী টেকনাফের বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের রেষানলে পড়ে সর্বহারা হয়ে গেলেন সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খান। কারামুক্ত হলেও মাথাগোঁজার ঠাঁই নেই। এখন হাসপাতালের বেডই তার ঠিকানা। চিকিৎসা শেষে কোথায় গিয়ে উঠবেন তা নিয়ে রয়ে গেছে অনিশ্চয়তা।

সমুদ্র জনপদে ফরিদুল মোস্তফাকে চেনে না এমন লোক খুব কমই। অপরাধের বিরুদ্ধে তার কলম সর্বদা সোচ্ছার ছিল। তবে প্রদীপ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কলম ধরতে গিয়ে ফেঁসে যান এই সাহসী কলম সৈনিক। প্রদীপের আগুনে সাজানো সংসার হয়ে যায় তছনছ। একেএকে ৬টি মামলার আসামী করা হলো। এসব মামলায় দীর্ঘ ১১ মাস ৫ দিন কারাভোগের পর গত ২৭ আগস্ট কারামুক্ত হন ফরিদ।

ফরিদুল মোস্তফা খান দৈনিক কক্সবাজার বাণী ও জনতার বাণী ডটকম-এর সম্পাদক ও প্রকাশক। তিনি টেকনাফ হোয়াইক্যং সাতঘরিয়া পাড়ার বাসিন্দা মরহুম ডাঃ ইছহাক খানের ছেলে। বর্তমানে শহরের ১ নং ওয়ার্ডের মধ্যম কুতুবদিয়া পাড়ার বাসিন্দা।

অস্ত্র, ইয়াবা ও বিদেশি মদের সাথে জড়িয়ে সর্বশেষ তিনটি মামলার আসামী বানিয়েছিলেন মেজর (অবঃ) সিনহার হত্যা মামলার অন্যতম আসামী টেকনাফের বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ।

কারামুক্ত হওয়ার পর ফরিদুল মোস্তফা বর্ণনা দেন প্রদীপের হাতে নির্যাতনের লোমহর্ষক কাহিনী।

ফরিদুল মোস্তফা বলেন, টেকনাফের ওসি প্রদীপের সাথে আমার ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই। আমার দুই দশকের সাংবাদিকতায় টেকনাফে যারা দায়িত্ব পালন করে গেছেন কারো সাথে আমার কোনদিন টু-শব্দও হয়নি। কারণ, কেউ সীমালংঘন করেনি।

ফরিদ বলেন, টেকনাফের ওসি প্রদীপ যোগদানের পর থেকে মাদক নির্মূলের নামের নিজেই বেপরোয়া মাদক সেবন ও ব্যবসা করেছে। টাকা না দিলে মানুষকে বন্দুকযুদ্ধ দিয়েছে। এলাকার নিরীহ মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি করেছে। ভিটেবাড়ি উচ্ছেদ করেছে।

ফরিদের বর্ণনা, প্রদীপকে যারা টাকায় বশীভূত করতে পারে এরকম বড় অপরাধীদের অপরাধকে ছোট করে ফেলে। টাকা না দিলে ছোট অপরাধীদেরকে অনেক বড় করে ফেলে। যেমন- একজনের কাছ থেকে ইয়াবা পেয়েছে ১০ লাখ, তাকে চালান দেওয়ার সময় দিয়েছে ২০০০ পিস। বাকিগুলো বিক্রি করে ফেলে। আবার কম ইয়াবা দেওয়ার জন্য ওদের কাছ থেকে অনেক সুবিধাও নেয়।

আবার অনেক লোক আছে যে, তার কাছে ১টা ইয়াবাও পায় নাই। অথচ তাকে এক্কেবারে ৫০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে চালান করেছে।

ফরিদ বলেন, এসব বিষয় নিয়ে আমি বিবেকের তাগিদে পেশাগত কারণে গত বছরের ২৪ জুন ‘টেকনাফে আইন শৃঙ্খলার অবনতি’, পরের দিন ‘টাকা না দিলে ‘বন্দুকযুদ্ধ দেন টেকনাফের ওসি প্রদীপ’ শিরোনামে বস্তুনিষ্ট সংবাদ প্রকাশ করেছিলাম। এই হচ্ছে আমার জীবনে কাল।

এই সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ক্ষিপ্ত হয়ে টেকনাফের থানা সীমানা ডিঙিয়ে কক্সবাজার শহরে অবস্থানরত আমার বাসায় একের পর এক অভিযান চালিয়ে আমাকে গ্রেফতার, গুম, খুন করার উৎসবে মেতে ওঠে প্রদীপ। এতে আমি জানমাল রক্ষার্থে পরিবার পরিজন নিয়ে ভিটেবাড়ি ভাড়া দিয়ে ঢাকা শহরে পালিয়ে যাই। সেখানে গিয়ে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি মহোদয়সহ সাংবাদিক সহকর্মীদের শরণাপন্ন হই।

মন্ত্রী মহোদয় আমার সার্বিক নিরাপত্ত্বার দেয়ার জন্য ওই সময় কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনকে ফোন করেন। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, মাসুদ হোসেন ওসি প্রদীপের সকল প্রকার কৃত কুকর্ম জানার পরও হয়তো তিনি সেদিন মন্ত্রী মহোদয়কে বলেছিলেন, আমি নাকি মাদকের ব্যবসা করি। আমি চলমান মাদক ও দুর্নীতি বিরোধী অভিযান থমকে দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতেছি। ওল্টাপাল্টা কথা বলে ‘মিসগাইড’ করেছেন। এক পর্যায়ে একটি গায়েবী মামলার অজুহাত দেখিয়ে ২১ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে টেকনাফের পুলিশ ঢাকা মীরপুরের বাসা থেকে আমাকে ধরে আনে। অথচ ওই মামলার বাদিকে আমি চিনি না। ঘটনাস্থান, সাক্ষি, সময়, তারিখ কিছুই জানি না।

ফরিদুল মোস্তফা দুঃখের সাথে বলেন, আমি আইনের ঊর্ধ্বে নই। গ্রেফতারের পরে আমাকে নিকটতম আদালতে সোপর্দ করবে, আশা করেছিলাম। ওসি প্রদীপের লেলিয়ে দেয়া বাহিনী (আমার মনে হয় না সেখানে সবাই পুলিশ ছিল) একজন সাব ইন্সপেক্টর পোষকধারী (নেমপ্লেটবিহীন) ছাড়া কাউকে বাংলাদেশের পুলিশ মনে হয় নি। কারণ, আমার দুই দশকের সাংবাদিকতা জীবনে কোন পুলিশকে এরকম খারাপ আচরণ করতে দেখি নি।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে সকল ভাল কাজে, মানুষের জানমালের নিরাপত্ত্বায় পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু আমাকে গ্রেফতার করার জন্য যে পুলিশগুলো পাঠিয়েছিলেন, তারা ছিল পেশাদার খুনি। পুলিশ এমন হতে পারে না।

গ্রেফতারের বিষয়ে ফরিদ বলেন, আমাকে একটা চাঁদাবাজির মামলার ওয়ারেন্টের কথা বলে প্রদীপ বাহিনী রাতের অন্ধকারে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে পুরো রাস্তায় বারবার ‘বন্দুকযুদ্ধ’ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। হয়তো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পথে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ দেয়নি। পরে টেকনাফ থানার ওসির রুমে নিয়ে যায়।

ওসি প্রদীপ কর্তৃক মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে ফরিদ বলেন, আমাকে দেখার পর ওসি প্রদীপ তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। পূর্ব থেকে উৎপেতে রাখা মাদকাসক্ত সিভিল কিছু টিএনএস বয়সের ছেলেপেলে দিয়ে আমার চোখ-মুখ বন্ধ করে মরিচের গুঁড়া ঢেলে দিয়েছে। আমার ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায়। আমাকে চিরতরে অন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। প্লাস দিয়ে আঙ্গুলের নখ তুলে ফেলার চেষ্টা চালায়। চতুর্দিকে বেদড়ক মারধর করে। পিটাতে পিটাতে অসহ্য হয়ে আমি চিৎকার করে পানি খুঁজি। যখন তৃঞ্চার্থ হয়ে গেলাম, পানি চাইলাম।

ভয়াল রাতের বর্ণনায় ফরিদ বলেন, ‘পানি পানি’ করার পর ওসি প্রদীপ তার প্যান্টের চেইন খোলে প্রশ্রাব এবং বাথরুম থেকে মলমুত্র এনে খাইয়ে দিতে চেয়েছে। এমন অবস্থায় ৪/৫ জন পুলিশ সদস্য থানার তিন তলার একটি কক্ষে ঢুকিয়ে সনাতনি ধর্মের লোকজন মারা গেলে যেভাবে রাখে, ঠিক সেভাবে আমাকে লটকিয়ে রাখে। আমি অচেতন ছিলাম। রাত প্রায় সাড়ে ১১ টার দিকে তারা আবার গিয়ে আমাকে কুকুরের মতো পিটিয়েছে। এরপর গাড়িতে তুলে টেকনাফ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে ডাক্তারের কাছে কি যেন বলে। তারপর একজন নার্স ও একজন মেডিকেল এসিসটেন্ট ইনজেকশন পুশ করার জন্য আসে। ওই ইনজেকশনটা আমার সন্দেহ হয়েছিল। মনে হয়েছে এটা পেইন কিলার নয়, এটা হয়তো ‘স্লো পইজন’ জাতীয় কিছু হতে পারে। আমি ইনজেকশন নিতে চাচ্ছিলাম না। তারপর প্রদীপ আমাকে সেখানে জোর করে ইনজেকশন দেওয়ার জন্য চড়-থাপ্পড় মারে। আমি ‘হাউমাউ’ করে চিৎকার করলে সেখান থেকে সোজা মেরিন ড্রাইভের দিকে নিয়ে আসে। তখন সড়কে একটা নয়, বিয়ের বহরের মতো ১৫/২০ টা গাড়ি, মনে হয়েছে সে দিন জেলা পুলিশের যত গাড়ি আছে সব গাড়ি আমার জন্য ব্যবহার করা হয়।

সেখানে পুলিশ পরিচয়ে খুনি ও মাদক ব্যবসায়ীরা ছিল। রাত প্রায় ১ টার দিকে পেছনে হ্যান্ডক্যাপ ও পেছনে গামছা বেঁধে আমাকে গাড়ি থেকে নামায়। এরপর আমার বুকে হাটু দিয়ে ধাক্কা দিলে আমি মাটিতে পড়ে গেছি। বলে, ‘কলমা পড়। তুই এবার শেষ।’

মুসলিম বিদ্বেষি প্রদীপের আচরণ তুলে ধরে ফরিদ বলেন, আমি যখন কলমা পড়া শুরু করেছি তখন আমাকে এক লাথি দিয়ে ঘাড় ধরে আবার গাড়িতে তুলে। গাড়ি কক্সবাজারের দিকে আসতে শুরু করেছে। আমি মনে করেছি, হয়তো বিপদ কেটে গেছে। বোধ হয় এবার কোর্টে সোপর্দ করবে। ভরসা পেয়ে গেছিলাম। এসপি অফিস বা মডেল থানায় সোপর্দ করবে ভাবছিলাম। কিন্তু না। দুর্ভাগ্য। আমাকে বালিকা মাদরাসার সামনের সড়ক দিয়ে কবিতা চত্ত্বরে নিয়ে গেছে। যেখানে সবসময় ‘অজ্ঞাতনামা লাশ’ পায় পুলিশ। এটা প্রদীপ বাহিনীর টর্চারসেল। সেখানে কয়েক দফা নির্যাতন ও ঝাউবীথিতে ঢুকিয়ে ক্রসফায়ারে দেওয়ার শেষ চেষ্টা চালায়। হয়তো উপরের কেউ না কেউ হয়তো মুঠোফোনে নিষেধ করেছে। অস্ত্র-মাদকের মামলার বিষয়টি উল্লেখ করে সাংবাদিক ফরিদ বলেন, টর্চারের এক পর্যায়ে আমাকে আবার গাড়িতে তুলে। রাগান্বিত হয়ে আমার কুতুবদিয়া পাড়ার বাসায় নিয়ে যায়। যে বাসাটি পুলিশের ভয়ে ছেড়ে পালিয়েছিলাম।
সেখানে অনেকটা চোর, ডাকাত বা দস্যুর মতো গিয়ে বাসার দরজা নক করতে করতে থাকে। হঠাৎ বাসা থেকে ছোট বোনদের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। তখন গাড়ি থেকে চিৎকার করে তাদের বলি, আমার মা-বোনের কোন অপরাধ নাই। তাদের কান্নার আওয়াজ যেন আমি না শুনি।
এক-দুই মিনিট যেতে না যেতেই দুইটি দেশীয় তৈরী বন্দুক, ৬ রাউন্ড কার্তুজ, তাদের মদ ইয়াবাগুলো নিয়ে উল্লাস করে আমাকে নিয়ে শহরের দিকে রওনা দেয়। ফজরের আগে আমাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেছে। আমার শরীরের চতুর্দিকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তখন ওসি প্রদীপসহ আরো কিছু পুলিশ সদস্য ডিউটি অফিসারের রুমে ঢুকে প্রায় আধাঘন্টা পর বের হয়।
মনে হয়, তারা আমাকে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বা মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে ডাক্তারকে বুঝিয়েছে। এরপর ডাক্তার সাহেবের কাছে গেলাম। আমাকে চিকিৎসা তো দূরের কথা মানুষের মতো করে ধরেও দেখে নি। শুধু আমাকে লিখে পরামর্শ দেয় যে, চক্ষু বিভাগের কাছে যান। অর্থোপেডিক্সেও কাছে যান। পরামর্শ দেয়ার পরে আমাকে কোন চিকিৎসা না দিয়ে থানায় নিয়ে যায়।
ফরিদুল মোস্তফা বলেন, আমি এক বছর আগে যা লিখেছি তা আজ সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। তখন ব্যবস্থা নিলে এতগুলো নিরীহ মানুষ ‘ক্রসফায়ার’ এর নামে প্রদীপের হাতে খুন হতো না। মেজর সিনহার মতো দেশের একজন সম্পদও হয়তো বেঁচে যেত।
প্রতিক্রিয়ায় তিনি আরো বলেন, প্রদীপের কারণে আমি সর্বহারা। মিথ্যা ও সাজানো ৬টি মামলা নিয়ে আমি কই যাব? ইতোমধ্যে দু’মুঠো নুনভাত ও মামলার খরচ চালাতে ভিটেমাটিও বিক্রি করে ফেলতে হয়েছে। আমি বিচার বিভাগীয় তদন্তপূর্বক মিথ্যা মামলাগুলোর প্রত্যাহার ও ক্ষতিপূরণ চাই।


 সূত্রঃ কক্সবাজার টাইমস 24.কম

এসএস/বি

Marcadores:

Post a Comment

[blogger]

যোগাযোগের ফর্ম

Name

Email *

Message *

Theme images by merrymoonmary. Powered by Blogger.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget